যাকাত বিষয়ক জিজ্ঞাসা

আমাদের দেশে রমজান মাসে অধিকাংশ মানুষ যাকাত আদায় করেন। বিশেষ করে করোনা ভাইরাসের কারণে যারা আরও পরে আদায় করতেন বা যারা নিয়মিত যাকাত আদায় করেন না তারাও যেন এই রমজান মাসে যাকাত আদায় করেন, সেহেতু যাকাত সম্পর্কিত জিজ্ঞাসা ও উত্তরের একটি নির্ভরযোগ্য সংকলন প্রাসঙ্গিক মনে করি। উল্লেখ্য, আমি নিজে কোন মাস’আলা প্রদান করিনি; শুধু ইসলামিক ফাউন্ডেশনসহ, প্রখ্যাত আলেমগণের মতামত এবং নিরভর্যোগ্য সোর্স থেকে যাকাত সম্পর্কিত কিছু জিজ্ঞাসা ও উত্তর সংকলন করেছি। আশা করি আলোচনাটি অনেকের জন্য সহায়ক হবে—

১। ব্যাংক নোটের যাকাতের বিধান কী এবং নিসাব হিসাবের মানদণ্ড কী?ব্যাংক নোট যেমন নগদ গচ্ছিত অর্থ, চেক, বিভিন্ন দলিল, বিল, শেয়ার সার্টিফিকেট, প্রাইজবন্ড ও অন্যান্য কাগজপত্র যার আর্থিক মূল্য আছে ইত্যাদির মূল্য যদি নিসাব পরিমাণ হয় এবং পূর্ণ এক বছর অতিবাহিত হয় তাহলে যাকাত ফরয হবে। নিসাব হিসাবের মানদণ্ডঃইসলামিক ফাউন্ডেশন অনুযায়ী ব্যাংক নোটের ক্ষেত্রে রুপার নিসাবের মূল্যকে নিসাবের মানদণ্ড ধরে যাকাত প্রদানের বিধান করা হয়েছে। অর্থাৎ, ৫২.৫ তোলা রূপা বা তার সমপরিমাণ বাজার মূল্য যদি থাকে— মোট অর্থের শতকরা ২.৫% যাকাত দিতে হবে। এটিই অধিকাংশ আলেমের মত। এর পিছনে কিছু যৌক্তিক কারণ আছে, যেমন—

(ক) এতে রয়েছে সতর্কতা ও দায়-মুক্তি। কেননা আল্লাহর নিকট রুপার মূল্যের উপর যাকাত গ্রহণযোগ্য যেহেতু রুপার মূল্য স্বর্ণের মূল্য অপেক্ষা কম। (খ) রুপার মূল্যকে টাকার যাকাতের মানদণ্ড নির্ধারণ করা হলে যাকাত দানকারীর সংখ্যা বাড়বে এবং গরিবদের উপকার বেশি হবে। তবে এতে আলেমদের মতভেদ আছে।

২। বছরের মাঝখানে উপার্জিত সম্পদের যাকাতের বিধান কী?যদি কারো কাছে নিসাব পরিমাণ অর্থ থাকে; ধরে নিই সেটা ১০০০০; আর বছর শেষে তার অর্থের পরিমাণ দাঁড়ায় ১৫০০০ তে; তাহলে সে কিভাবে যাকাত আদায় করবে? এ ব্যাপারে বিস্তারিত– এই অতিরিক্ত অর্থ যদি মূল অর্থের মাধ্যমে অর্জিত হয় (অর্থাৎ, মূল দশ হাজার যদি বিনিয়োগ করার মাধ্যমে লাভ হয় পাচ হাজার হয়) তাহলে বছর শেষে সর্বমোট অর্থের যাকাত আদায় করতে হবে। কেননা বিধি হচ্ছে- লাভ পুঁজির বিধানের অনুগত। যদি এই অর্থ মূল অর্থের মাধ্যমে অর্জিত না হয়। অন্য কোন মাধ্যমে অর্জিত হয়ে থাকে যেমন- উত্তরাধিকার, উপঢৌকন, কোন কিছু বিক্রি ইত্যাদি তাহলে এ সম্পদের আলাদা বছর হিসাব করা হবে। যেদিন এই অতিরিক্ত সম্পদ মালিকানায় এসেছে সেদিন থেকে বছর গণনা শুরু হবে। তবে কেউ যদি মূল অর্থের সাথে যাকাত আদায় করে দিতে চায় সেটাও করতে পারেন। সেক্ষেত্রে তিনি এ অতিরিক্ত অর্থের যাকাত ফরজ হওয়ার আগেই অগ্রিম আদায় করে দিলেন। এতেও কোন অসুবিধা নেই। কারো ক্ষেত্রে এই অতিরিক্ত অর্থ ক্রমান্বয়ে অর্জিত হয়ে থাকতে পারে। যেমন আপনি মাসিক বেতনের ক্ষেত্রে মাসে মাসে কিছু সঞ্চয় হয়। যেমন একমাসে ৫০০০ সঞ্চয় হলো, অন্য মাসে ১০০০০ সঞ্চয় হলো, এভাবে বছর শেষে ১০০০০০ হলো। এই ক্ষেত্রে সুযোগ আছে যে, মূলধনের যাকাত আদায়ের সময় অতিরিক্ত অর্জিত অর্থের যাকাতও আদায় করে দিতে হবে। সেক্ষেত্রে অতিরিক্ত অর্জিত অর্থের যাকাত নির্দিষ্ট সময়ের আগেই আদায় হয়ে যাবে। আর ইচ্ছা করলে কেউ প্রত্যেকবার অর্জিত সম্পদের আলাদা বছর হিসাব করতে পারেন। তবে এভাবে হিসাব রাখা কঠিন। কারণ এক্ষেত্রে এক বছরে কয়েকবার যাকাত আদায় করতে হবে।৩। ব্যবহার্য অলঙ্কারের যাকাতের বিধান কী?এব্যাপারে আহলে ইলেমগণ একাধিক মত পোষণ করেছেন। কেউ ব্যাখ্যা দিয়ে বলছেন- দেখতে হবে স্বর্ণ-রুপা সাজ-সজ্জার জন্য; নাকি সঞ্চয় করার জন্য; নাকি ব্যবসা বা অন্য কোন কাজের জন্য। অধিক বিশুদ্ধ মত হচ্ছে— নিসাব পরিমাণ স্বর্ণ-রুপার ওপর হিজরি এক বছর পূর্ণ হলে যাকাত ফরয হবে তা যে উদ্দেশ্যেই সংগ্রহ করা হউক। কারণ যাকাত ফরয হওয়ার দলিল সব প্রকার স্বর্ণ-রুপাকে শামিল করে, কোন শর্ত যুক্ত করে কোন প্রকার স্বর্ণ-রুপা যাকাত থেকে বাদ দেওয়া হয়নি। যেহেতু আলেমদের মাঝে মতবিরোধ আছে, তাতে দ্বিমত করার সুযোগ আছে। তবে ইসলামিক ফাউন্ডেশন এক্ষেত্রে কোন পার্থক্য করেনি।৪। প্রভিডেন্ট ফান্ডের ক্ষেত্রে—- সরকারী প্রতিষ্ঠানে বা যে সকল কর্পোরেশনে সরকারী নিয়মানুযায়ী প্রভিডেন্ট ফান্ড কর্তন করা হয়, উক্ত প্রভিডেন্ট ফান্ডের কর্তৃনকৃত টাকার উপর যাকাত ওয়াজিব হবে না। তবে এই টাকা গ্রহণ করার পর একবছর পূর্ণ হলে সম্পূর্ণ টাকার উপর যাকাত প্রদান করতে হবে। যদি তার পরিমাণ ৫২.৫ তোলা রূপার মূল্যের সমপরিমান হয় তার শতকরা ২.৫ ভাগ। (ইসলামিক ফাউন্ডেশন অনুযায়ী)- কোন বেসরকারী প্রতিষ্ঠান বা ব্যক্তির উদ্যোগে প্রভিডেন্ট ফান্ড গঠন করা হলে প্রতি বছর তার উপর যাকাত দিতে হবে। যদি তার পরিমাণ ৫২.৫ তোলা রূপার মূল্যের সমপরিমান হয় তার শতকরা ২.৫ ভাগ। (ইসলামিক ফাউন্ডেশন অনুযায়ী)

0 0 votes
Article Rating
Subscribe
Notify of
guest
0 Comments
Inline Feedbacks
View all comments